MISSION

‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যারিস্টার একটা সামাজিক উপাধি ছাড়া কিছুই না’

ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল

ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। একই সঙ্গে তিনি জাতীয় রাজনীতিতেও ভূমিকা রাখছেন। বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। চট্টগ্রামের প্রাণ পুরুষ খ্যাত, সাবেক সিটি মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী হলেন তার বাবা।

সম্প্রতি ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডট কম সম্পাদক ড. বদরুল হাসান কচি আইন, আদালত, রাজনীতি প্রসঙ্গে কথা বলেন আইনজীবী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল’এর সাথে। আলোচনায় উঠে আসে নানান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-   

আইনজীবী হবার ইচ্ছে কি আপনার না অভিভাবকের ছিল?

ব্যারিস্টার নওফেল : ফিজিক্সে (physics) দারুন ইন্টারেস্ট ছিল বলে নিজের ইচ্ছে ছিল অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হব। কিন্তু পরিবারের চাওয়া ছিল আইনজীবী হতে হবে। সে অনুযায়ী ব্যারিস্টারি পড়েছি। এ লেভেল শেষ করে লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স থেকে আইন ও নৃবিজ্ঞানের ওপর বিএ সম্পন্ন করি। এরপর বার কোয়ালিফিকেশন হিসেবে পরিচিত বার কোর্স করি। কলেজ অব ল’ (বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব ল’) থেকে আইনের ওপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা করি। এরপর লিংকনস ইন – এর সদস্য হবার জন্য ডাক আসে।

আমাদের দেশে অ্যাডভোকেট এবং ব্যারিস্টারের মধ্যে তফাৎ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে একটি দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে। অনেকে ভাবেন ব্যারিস্টাররা সম্ভবত অ্যাডভোকেটদের চেয়ে ভাল উকিল! – এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কি?

ব্যারিস্টার নওফেল : ব্যারিস্টাররা অ্যাডভোকেটদের চেয়ে ভাল উকিল এমন ধারণা ভুল। এটা সম্পূর্ণ একটা মিস কনসেপ্ট। পুরো বিষয়টা একটু পরিষ্কার করে বলি। যুক্তরাজ্য (united kingdom) চারটা রাজ্যে বিভক্ত। ইংল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড এবং নর্দান আয়ারল্যান্ড। এরমধ্যে ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসে আইন পেশা দুই ভাগে বিভক্ত, সলিসিটর এবং ব্যারিস্টার। যারা কোর্টে প্র্যাকটিস করবে, রেটিগেশন করবে তথা কোর্ট বিষয়ক পরামর্শ দেবে তারা ব্যারিস্টার। অন্যদিকে যারা কোর্ট ব্যতীত অন্যান্য যাবতীয় আইনি বিষয়ে পরামর্শ দেবে তারা সলিসিটর। তবে দু’জনই যোগ্যতায় সমানে সমান। এখন ব্যারিস্টারি পড়ে কি শেখা যায় সে বিষয়ে একটু বলি, ব্যারিস্টারি আসলে করা হয় ইংল্যান্ডের আদালতে প্র্যাকটিস করার জন্য। এখানে সে দেশের ফৌজদারি ও দেওয়ানী কার্যবিধি, সাক্ষ্য আইন এবং আদালতের যে কার্যবিধি সেসব বিষয় জানা যায়। এর সঙ্গে বাংলাদেশে প্র্যাকটিসের সঙ্গে মিল নেই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যারিস্টার একটা সামাজিক উপাধি ছাড়া কিছুই না। যেমন হজ্ব করে এসে অনেকেই আলহাজ্ব লিখেন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যারিস্টারও শ্রেফ তেমন একটা সামাজিক উপাধি। আমি মনে করি গণসচেতনতার অভাবে সাধারণ মানুষের মনে একটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে যে ব্যারিস্টাররা সম্ভবত অ্যাডভোকেটদের চেয়ে ভাল উকিল! যে ভাল উকিল সে ব্যারিস্টার হোক বা না হোক সে ভাল উকিল। আরেকটা বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে প্র্যাকটিস করতে হলে ব্যারিস্টার হলেও অ্যাডভোকেটশীপ নিতে হবে। আমাদের আইন পেশায় একটাই উপাধি, আর তা হল অ্যাডভোকেট। আমাদের দেশের আইনে কেবল অ্যাডভোকেটরাই কোর্ট অফিসার।

তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যারিস্টার হয়ে আসলেই ভাল আইনজীবী ভাবার সুযোগ নেই?

ব্যারিস্টার নওফেল : অবশ্যই, কারণ ইংল্যান্ডের দেওয়ানী ও ফৌজদারি কার্যবিধি শিখে বাংলাদেশের আদালতে কিভাবে প্র্যাকটিস করবেন? বাংলাদেশে প্র্যাকটিস করতে হলে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের তালিকাভুক্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অ্যাডভোকেট হতে হবে। বাংলাদেশের ফৌজদারি ও দেওয়ানী কার্যবিধি, সাক্ষ্য আইন ইত্যাদি শিখতে হবে। আমি আইন শিক্ষার্থীদেরও বলবো এ বিষয়ে সচেতন হতে। ইংল্যান্ডে গিয়ে পয়সা খরচ করে ব্যারিস্টারি পড়ে এসে লাভ নেই। অনেকেই অজ্ঞতা প্রসূত এই ভুলটি করে থাকেন। আমি মনে করি ইংল্যান্ডে গিয়ে ব্যারিস্টারি না পড়ে সাবস্ট্যান্টিভ (substantive) আইন পড়া অনেক বেশি উপকারী হবে। বিশেষ করে এল.এল.এম করা শ্রেয়। কেননা একটা আন্তর্জাতিক কর্মাশিয়াল বিষয়ের ওপর এলএলএম করলে বরং প্রায়োগিক কিছু শেখা যাবে।

এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসা যাক। আপনি তো সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, উচ্চ আদালতের রায় বাংলায় দেওয়া উচিৎ বলে আপনি মনে করেন কি?

 ব্যারিস্টার নওফেল : একটা উদাহরণ দিয়ে বলি, ১৯৯৬ সালে ইংল্যান্ডের আইনি কাঠামোতে সংস্কার আসে। এসময় পুরো লিগ্যাল সিস্টেমে ব্যাপক পরিবর্তন করে আধুনিকায়ন করা হয়।  ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি লর্ড উল্ফ বলেন, যে ভাষা জনগণ বোঝে না সে ভাষায় বিচারকার্য পরিচালনা জনগণের প্রতি অবিচার। পরে বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের বোধগম্য করার জন্য ইংলিশ ল’ তে প্রচলিত সকল ল্যাটিন শব্দ বাদ দেওয়া হয়।

অথচ আমরা এখনো ঔপনিবেশিক ধ্যান ধারণা নিয়ে পড়ে আছি। যদিও আমরা নিজেদের ব্রিটিশ কমন ল’ এর অনুসারী দাবি করে থাকি। পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নাই যেখানে শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষ এক ভাষায় কথা বলে আর উচ্চ আদালত চলে অন্য ভাষায়! এটা তো অবিচার। মানুষ যদি না-ই বুঝে আদালত কি রায় দিয়েছে তাহলে সে কিভাবে বুঝবে যে সে ন্যায় বিচার পেয়েছে? জনগণ যদি কোর্ট ফি দিয়ে নিজ ভাষায় রায় না পায় তাহলে সেটা জনগণের প্রতি অবিচার। জনগণের প্রতি সুবিচার করতে সাধারণ মানুষের ভাষায় (বাংলা) আদালতের রায় আনা জরুরী। এছাড়া উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে ঢাকাতেই কেন আসতে হবে? অন্তত দেশের বিভাগীয় শহরে উচ্চ আদালতের সার্কিট বেঞ্চ স্থাপন করে বিচারব্যবস্থাকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে হবে।

সম্প্রতি ভারতের কেরালা রাজ্য সরকার শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের মাসিক ভাতা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে; আপনি তো কিছুদিন আইনে শিক্ষকতাও করেছেন, জুনিয়র আইনজীবী হিসেবে সময় পার করে এসেছেন, আমাদের দেশে এ প্রথা চালু করার প্রয়োজনীয়তা কেমন মনে করেন?

ব্যারিস্টার নওফেল : আইনের ডিগ্রি নিয়ে প্রফেশনাল লাইফের প্রথম ধাপে বেশীরভাগ সময় আদালতে এসে শিক্ষানবীশ আইনজীবীরা আর্থিক সঙ্গতির অভাবে মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়। আইনের প্রয়োগ ও বাস্তবিক জ্ঞান অর্জনের এই সময়টাতে জীবনের তাদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়। বাংলাদেশ বার কাউন্সিল যদি শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের জন্য মাসিক ভাতা চালু করে সেটা তাদের বেশ সহায়ক হবে। এছাড়া এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে ইংল্যান্ডের মত আমাদের দেশেও দ্বিস্তর বিশিষ্ট আইন পেশার কাঠামো থাকা জরুরী। অর্থাৎ একটি হবে আদালত ভিত্তিক আইন পেশা এবং অন্যটি পরামর্শ ভিত্তিক আইন পেশা। আইন পেশায় এই সংস্কার যদি আনা হয় তাহলে পরামর্শ ভিত্তিক আইন পেশায় জড়িতরা চট করেই সমস্যাটিকে মামলায় রূপান্তরিত করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসবে। ফলে আমাদের পাহাড় সমান মামলার জটে নতুন মামলা যুক্ত হবার সম্ভাবনা কমে যাবে। কিন্তু আমাদের দেশে কেউ পরামর্শ নিতে চাননা। আইনজীবীদের সার্ভিসটা কেবল মামলা ভিত্তিক। যে কারণে যেকোনো সমস্যাই দ্বন্দ্বে বা মামলায় রূপান্তরিত করার প্রবণতা বেশি। কেননা মামলা ছাড়া আইনজীবী অচল। মামলার মেরিট থাকুক বা না থাকুক মামলা না হলে তো মক্কেল পয়সা দেবে না। অন্যদিকে যদি দ্বিস্তর বিশিষ্ট আইন পেশা হয় তাহলে এক স্তরে পরামর্শক তথা সলিসিটর হিসেবে কেউ থাকবেন, যারা সমস্যার আদ্যোপান্ত জেনে কি করণীয় সে বিষয়ে পরামর্শ দেবেন। অন্যদিকে যে সকল সমস্যায় মামলা করার মত মেরিট থাকবে সেগুলো আদালত ভিত্তিক আইন পেশায় জড়িত অ্যাডভোকেটরা মামলা পরিচালনা করবেন। আর এই দ্বিস্তর বিশিষ্ট আইন পেশার কাঠামো বাস্তবায়নে আইন মন্ত্রণালয়, বার কাউন্সিল এবং আইনজীবী নেতাদের উদ্যোগ নিতে হবে।

আপনি তো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, আইনজীবীদের রাজনৈতিক সম্পৃকতা বেশী জরুরী মনে করেন কি?

ব্যারিস্টার নওফেল : আইনজীবীদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন বয়ে আনে। এক সময় আইনজীবীরাই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মূলত অধিকার নিয়ে সংগ্রাম এবং নীতি প্রণয়নের সমন্বয় হচ্ছে রাজনীতি। ফলে অধিকার বাস্তবায়ন ও নীতি প্রণয়নে আইনজীবী সর্বদা অগ্রগণ্য। তবে এর মানে এই নয় যে আইনজীবীরাও কেবল রাজনীতি করার অধিকার রাখে। যোগ্য যেকোন ব্যক্তিই রাজনীতি করতে পারেন। তবে রাজনীতিতে আইনজীবীদের সক্রিয় উপস্থিতি রাজনীতির মানোন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। পৃথিবীর বেশীরভাগ উন্নত দেশেই আইনজীবীরা রাজনীতিতে বেশ সক্রিয়। আইনজীবীরা স্বাধীন পেশার মানুষ। ফলে তারা কোন স্বার্থের সাথে সংশ্লিষ্ট নন । আর পেশাগত স্বার্থ সংশ্লিষ্টতা বা স্বার্থ সংঘাত না থাকলেই জনস্বার্থে সবচেয়ে বেশি কাজ করা যায়। স্বাধীন পেশার মানুষ হওয়ায় আইনজীবীরা স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে সার্বজনীন হতে পারেন। আরেকটা বিষয় হচ্ছে টেকনিক্যাল। পার্লামেন্টে আইন প্রণয়ন ও ড্রাফটিংসহ প্রণীত আইন অন্য আইনের সাথে সাংঘর্ষিক কি-না সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ে আইনজীবী সংসদ সদস্য হওয়া জরুরী।

ধন্যবাদ আপনাকে।

ব্যারিস্টার নওফেল : ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডট কম’কে অনেক ধন্যবাদ।

28575817_188841328545729_2355786402026694587_n.jpg

‘ভর দুপুরে একজন বৃদ্ধ দোকানে এসে বললেন, ‘একটা কেক দাও তো মিয়া ভাই!’ দুপুরটা রোদে খঁ-খাঁ করছে। এমন ভর দুপুরে একটা মানুষ কেক খাবে? ব্যাপারটা খটকা লাগল! সহজ কঠিন সব ব্যাপারেই পুলিশের খটকা লাগে! এটা স্বাভাবিক!

‘চাচা মিয়া, দুপুরবেলা কেক খান ক্যান?’
‘বাবারে, হোটেলে খাওনের ট্যাহা নাই! কেকটা খায়া প্যাট ঠাণ্ডা করি!’
‘প্রতিদিন খান কই?’
‘বাড়িতে! কিন্তু দুপুরে যাওন যায় না। মালিকের হুকুম। আধাঘণ্টার মইধ্যে দুপুরের খাওন শ্যাষ করন লাগব! ইট ভাটার কাম খুব কড়া! বেশি কড়া ভাটার মালিক!’
‘তো বাড়িতে খেয়ে আসেন!’
‘নারে বাপ! যাইতে-আইতে রিকশাভাড়া লাগে। আবার আধাঘণ্টায় কুলানো যায় না!’
আমি আশ্চর্য হলাম। এভাবে একটি বৃদ্ধ কাজ করবে অথচ দুপুরে কেক দিয়ে পেট ঠাণ্ডা করবে- বিষয়টি অদ্ভুত! একটু আগেই আমি খেয়েছি। বৈষম্যের প্রাচীর ভেদ করে খাবারটুকু পেট থেকে বমি হয়ে বের হতে চাইছে!
বললাম, ‘চাচা চলেন আমার সাথে!’

তিনি ভয় পেয়ে গেলেন! ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘স্যার কই নিয়া যাবেন?’
আমি বললাম, ‘স্যার বলতে হবে না! আমি আপনার সন্তানের মতো। চলেন!’
রেস্টুরেন্টে লোকজন ভর্তি! পাশ থেকে একজন বলছে, ‘শালার পুলিশের ধর্ম নাই! বুড়া লোকটারে নিয়া যায় কই?’ আমি শুনলাম। না জেনে হুটহাট করে মন্তব্য করা একদল মানুষ আছে! এরা এই দলের। মাথা গরম করলাম না। ছোটখাট বিষয়ে মাথা গরম করা পুলিশের বৈশিষ্ট্য না।

হোটেলের এক কোণায় বৃদ্ধ চাচাকে বসালাম। চাচা ভয়াবহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। এতটা অবাক হয়তো জীবনে কখনো হননি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, গরু খাবেন না মুরগি?
গরুর কালা ভুনা। সাথে শসার সালাদ। লেবুর টুকরাকে চিপে চিপে সব রস বের করে দুই প্লেট ভাত খেলেন বৃদ্ধ! আমি মুগ্ধ হয়ে তার খাওয়া দেখছি! পৃথিবীতে এত সুন্দর দৃশ্যও থাকতে পারে।

হোটেলের ম্যানেজার আসলেন। বললেন, স্যার কোল্ড ড্রিংস দিব? আরসি? সেভেন আপ? আমি জবাব দিলাম না। রেস্টুরেন্টের ম্যানেজাররা সাধারণত ক্যাশ টেবিল ছেড়ে একচুলও এদিক-ওদিক হন না। আর তিনি আমার কাছে এসে সেভেন আপ অফার দিচ্ছেন! ব্যাপারটা আমার কাছে খটকা লাগল! ছোটখাটো ব্যাপারও পুলিশের কাছে খটকা লাগে! এটা স্বভাবিক!

আমার নিরুত্তর থাকা তাকে চলে যেতে বাধ্য করল। হয়তো-বা আরো কিছুক্ষণ থাকত। ক্যাশে টাকা দিতে গিয়ে বাঁধল বিপত্তি! ম্যানেজার আমার টাকা নেবেন না! আশ্চর্য তো! জানতে চাইলাম টাকা নেবেন না কেন? ম্যানেজার খুব গুছিয়ে কথা বললেন, ‘সেবাই মানুষের ধর্ম! তো আপনি একাই সেবা করে ধর্ম করবেন, আমি করব না?’
বললাম, বুঝিনি! সোজা বাংলা ভাষায় কথা বলো! পেঁচিয়ে কথা বলার জন্য বায়ান্নতে রক্ত দেয়নি জব্বার-রফিকরা! ম্যানেজার সহজ ভাষায় বললেন, বৃদ্ধ চাচাকে আপনি খাওয়াতে নিয়ে এসেছেন। সুন্দর কাজ। এবার আপনার সুন্দর কাজে আমিও যোগ দিলাম। দেড় শ টাকা বিল নেব না। হোটেল মালিককে আমি টাকাটা দিয়ে দেব।

আমি বললাম, তা কি করে হয়? আমি এনেছি!
ম্যানেজার বললেন, আমাকে কি তাহলে ভালো কাজ করার সুযোগ দেবেন না?
এবার আমি হেরে গেলাম। কিছু হার মধুর! আনন্দের! হেরে গেলে জিতে যায় মানবতা! একটি সুন্দর কাজ আর একটি সুন্দর কাজের জন্ম দেয়! রেস্টুরেন্ট থেকে বের হলাম একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। পৃথিবীটা আরো কিছু দিন বেঁচে থাকুক। হাজার কোটি বছর টিকে আছে এদের মতো ভালো মানুষগুলোর জন্যই! এই মানুষগুলোর পায়ের স্পর্শ আছে বলেই, মনে হয় পৃথিবীটা অবিরাম ঘুরছে। তা না হলে, এত বড় সূর্যের চার পাশে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে যেত।

বৃদ্ধ চাচাকে তার কর্মক্ষেত্রে ফিরতে হবে। ভরপেটে খেয়ে এই ভরদুপুরে হেঁটে গেলে তিনি কাজ করতে পারবেন না। একটা রিকশা ডাকলাম। ভাবলাম, একটু দরকষাকষি করে দশ-বিশ টাকায় রিকশাটা ম্যানেজ করে দিই!
রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাড়া কত? রিকশাওয়ালা যা জবাব দিল তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। সে জানাল, ভাড়া লাগব না স্যার! বুড়া মানুষ যাইব! আমি ভাড়া নিমু না, স্যার! বহুত কামাই করছি! মনে হলো অদৃশ্য কেউ একজন আমার শার্টের কলার চেপে ধরে গালে একটা চটাস করে থাপ্পড় দিয়ে শাসাচ্ছে; ব্যাটা ভাড়া কমানোর জন্য দরকষাকষির চিন্তা করিস? মানুষ চিনলি না?

চিলের মতো ছোঁ মেরে রিকশাওয়ালা বৃদ্ধাকে নিয়ে গেল! রিকশা চলছে! চলন্ত চাকার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছি। এই মহান মানুষগুলোর পায়ের স্পর্শে এই পৃথিবীটা রিকশার চাকার মতো ঘুরছে। মনে হলো মানুষ মরে যাচ্ছে; মানবতা বেঁচে আছে। হিসেবের খাতা খুলে হিসেব করলাম, একটি সুন্দর কাজ দুটি সুন্দর কাজের জন্ম দেয়! আমি ইট ভাটার মালিককে ফোন দিলাম। থানার দারোগা পরিচয় দিয়ে বললাম, আপনার ইট ভাটার শ্রমিকদের দুপুরে খাবার সময় কম দেন কেন? বেতনও নাকি কম দেন?

‘স্যার! স্যার!’
‘আরে মিয়া স্যার স্যার করেন কেন?’
‘জ্বি স্যার! জ্বী স্যার!’
‘ভাটার বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেব?’
‘না স্যার! না স্যার! দেইখেন কালকেই সব ঠিকঠাক করে দিব!’
আমি ফোন রেখে দিলাম। খুব অল্প সময়ে খুব অল্প চেষ্টায় কিছু কিছু অধিকার এনে দিতে পারি। চাইলেই হয়; কষ্ট করতে হয় না! নতুন করে হিসেব করলাম; একটি ভালো কাজ তিনটি ভালো কাজের জন্ম দেয়!
‘স্যার! স্যার!’

পেছনে তাকিয়ে দেখি রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার! কাছে এসে একটি মুচকি হাসি দিল। বলল, স্যার আপনাকে খবরটা জানাতে আসলাম। আমি অভিভূত হলাম। রেস্টুরেন্টের মালিক তার ম্যানেজারকে আজকের বিতর্কিত বিলটি পাস করাতে দেননি। বৃদ্ধ চাচার দুপুরের খাবারের টাকা মালিক ম্যানেজারের কাছ থেকে নেননি! বরং মালিক তার ম্যানাজারকে ধন্যবাদ দিয়েছে! বেতনও বৃদ্ধি হয়েছে! বেচারা ম্যানেজার আনন্দে আপ্লুত!

বিকেল হয়ে এলো! ক্লান্ত সূর্য ঢলে পড়ছে দিগন্তে! যেন লুকাতে চাইছে! অবসর চাইছে! সারাদিনের ক্লান্তি কাটাতে সে সারারাত ঘুমাবে! আমার ডিউটি আপাতত শেষের দিকে। থানায় ফিরব। ফোর্স গাড়িতে উঠল। আমি হিসেবের খাতা ছুড়ে ফেলে দিলাম। ফলাফল মুখস্ত। দিন শেষে হিসেব হলো, একটি সুন্দর কাজ আরেকটি সুন্দর কাজের জননী!
‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’- বলে চিৎকার করা একদল মানুষকে আজ খুব খুঁজতে ইচ্ছা করছে। বলতে ইচ্ছা করছে ‘দ্যাখ ব্যাটা! মানবতা আজও মরেনি! মানুষ মরে; মানবতা মরে না; মানবতা বেঁচে থাকে! তোমরাই তাকে খুঁজে পাও না…!’ দোয়া করা ফরজ এই মানুষটির জন্য। পাথেয় হোক তিনি আমাদের সবার জন্য।

পারভিন সুলতানা

23844805_387709014991959_2442645766223979764_n

মা::: নিজের জীবন দিয়ে
সন্তানকে বাঁচিয়েছেন, একটি বার
মা:::::শব্দটি লিখুন?????

ছুটিতে ঘুরে আসুন দার্জিলিং, কত খরচ?

রাতে শ্যামলী বাসে যাত্রা করে ভোরে বুড়িমারি সীমান্তে। নাস্তা আর ইমিগ্রেশনের সব প্রক্রিয়া শেষ করতে ১০/১১টা বেজে যাবে। ওপারে চ্যাংড়াবান্দায় ইমিগ্রেশন আনুষ্ঠানিকতা সেরে শ্যামলীর বাসে শিলিগুড়ি। টাকা বা ডলার সরকার অনুমোদিত ডিলারের কাছে রুপিতে পরিবর্তন করুন। অন্যথায় পরবর্তীতে ভাঙাতে সমস্যা হতে পারে।

চ্যাংড়াবান্দা থেকে ময়নাগুড়ির বাসে দেড় ঘণ্টায় শিলিগুড়ি জিপ স্টেশনে। সেখান থেকে দার্জিলিংগামী টাটা সুমো বা কমান্ডার জিপের টিকিট সংগ্রহ করে আড়াই ঘণ্টায় দার্জিলিং।

কলকাতা শিয়ালদহ রেল স্টেশন থেকে রাত ১০টায় দার্জিলিং মেল। টিকিট নেবেন ট্যুরিস্টদের জন্য নির্ধারিত কাউন্টার ফেয়ারলি প্যালেস থেকে। পরদিন সকাল ১০টায় নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন। এখান থেকে রিকশায় শিলিগুড়ি জিপ স্টেশন। কলকাতা থেকে বিকাল ৪টা বা সন্ধ্যা ৬/৭ টায় পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন ছেড়ে, সকালে পৌঁছায়। সেখান থেকে দার্জিলিংয়ে।

কোথায় থাকবেন?
দার্জিলিং শহরে সব মানের হোটেল আছে। গচ্ছা দিতে না চাইলে দালাল এড়িয়ে নিজে হোটেল ঠিক করুন। তবে ঠিক করার আগে জেনে নিন গরম পানি আর রুম হিটারের ব্যবস্থা আর বেড়ানোর জন্য জিপসহ তাৎক্ষণিক সেবা সম্পর্কে।

খাবার-দাবার
হোটেলে বাঙালি খাবারসহ সব ধরনের খাবারের ব্যবস্থা আছে। এছাড়া ভোরবেলায় বেড-টি এবং ডিনারের আগে ইভনিং-টির ব্যবস্থা থাকে।

কোথায় বেড়াবেন?
পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু রেলওয়ে স্টেশন ঘুম। সমুদ্র-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে অপূর্ব সূর্যোদয় দেখা।
খুব ভোরে ৮ হাজার ৩’শ ফুট উঁচু টাইগার হিল থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা পাহাড় চূড়ায় সূর্যোদয়ের অসাধারণ দৃশ্য। পৃথিবীর বিখ্যাত প্রার্থনা স্থান ঘুম মোনাস্ট্রি।
ছবির মতো সুন্দর স্মৃতিসৌধ বাতাসিয়া লুপ। বিলুপ্ত-প্রায় পাহাড়ি বাঘ ঝহড়ি খ্যাত দার্জিলিং চিড়িয়াখানা।

পাহাড়ে অভিযান শিক্ষাকেন্দ্র হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট। সর্বপ্রথম এভারেস্ট বিজয়ী তেনজিং-রক- এর স্মৃতিস্তম্ভ।
কেবল কারে ১৬ কিমিটার এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে ভ্রমণ। হ্যাপি ভ্যালি টি গার্ডেনে পৃথিবী খ্যাত ব্ল্যাক টি পানের অপূর্ব অভিজ্ঞতা।
যুদ্ধবিধ্বস্ত শরণার্থী কেন্দ্র তিব্বতিয়ান সেলফ হেলপ্ সেন্টার। প্রায় ৮’শ ফুট উঁচুতে দার্জিলিং গোরখা স্টেডিয়াম।

নেপালি জাতির স্বাক্ষর বহনকারী দার্জিলিং মিউজিয়াম। পৃথিবীর বিখ্যাত বৌদ্ধ বিহার জাপানিজ টেম্পল,
ব্রিটিশ আমলের সরকারি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র কাউন্সিল হাউস লাল কুঠির অসাধারণ শৈল্পিক নিদর্শন খ্যাত আভা আর্ট গ্যালারি।
শতবর্ষের প্রাচীন মন্দির দিরদাহাম টেম্পল। পাথর কেটে তৈরি রক গার্ডেন এবং গঙ্গামায়া পার্ক।
হিমালয় কন্যা কাঞ্চন-জংঘা, পানির অবিরাম ঝর্ণাধারা ভিক্টোরিয়া ফলস্ এবং সুসভ্য জাতির সংস্কৃতি।
[দার্জিলিং কিভাবে যাবেন, কত খরচ?]
দার্জিলিংয়ে কেনাকাটা

দার্জিলিং শহরের লাডেন-লা রোডের মার্কেটে ক্রয়-ক্ষমতার মধ্যে শীতের পোশাক, হাতমোজা, কানটুপি, মাফলার, সোয়েটারসহ লেদার জ্যাকেট, নেপালি শাল এবং শাড়ি, অ্যান্টিক্স ও গিফট আইটেম, লেদার সু, সানগ্লাস। প্রতারনার শংকা নেই। তবে ভ্রাম্যমাণ ফেরি থেকে শাল, শাড়ি না কেনাই ভাল। যেতে বা আসতে শিলিগুড়ির বিধান মার্কেট থেকেও কেনাকাটা করা যায়।

ভ্রমণের সময়
শীতের শুরু বা শেষের দিকে দার্জিলিং ভ্রমণের জন্য ভালো। দার্জিলিং এ পাহাড়ি ধস নামে বর্ষা মৌসুমে। শীত বা গরমে সে ঝুঁকি নেই। ঠাণ্ডার এড়াতে গরম কাপড় নেয়া জরুরি। হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে চলাফেরা করলে দালাল বা হারিয়ে যাওয়ার শংকা থাকে না।

বেড়ানোর মোট খরচ
ঢাকা থেকে দার্জিলিং থাকা, খাওয়া, যাতায়াত বাবদ প্রতিজনে সর্বোচ্চ খরচ ১৫ হাজার টাকা হতে পারে । বুড়িমারি দিয়ে খরচ কম। কলকাতার হয়ে গেলে খরচটা বাড়বে। ট্যুরিজম কোম্পানি প্যাকেজ ট্যুর করে থাকে।

আশপাশে কি দেখবেন?
দার্জিলিং থেকে মিরিক লেক ও নেপালের পশুপতি মার্কেট জিপে ঘুরে আসুন সকাল ৯টা-বিকাল ৫টার মধ্যে। সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে দার্জিলিংয়ের টয় ট্রেনে কার্শিয়াংয়ে থাকার পরে শিলিগুড়ি। যাত্রার দিন থেকে ৫ দিনেই ঘুরে আসতে পারেন। ভারতীয় ভিসার আবেদনপত্র পূরণের সময় স্থলবন্দরের নাম উল্লেখ করুন।

weqewqe

Close to Allah by read and watch -DAILY

Close to Allah by read and watch -DAILY

Advertisements